মুখের আলসার কেন হয়? কারণ, লক্ষণ, চিকিৎসা ও করণীয়
মুখের ভেতরের নরম টিস্যু, জিহ্বা, মাড়ি কিংবা গালের ভেতরের অংশে এক ধরণের বেদনাদায়ক ক্ষত সৃষ্টি
হওয়া আমাদের অত্যন্ত পরিচিত একটি স্বাস্থ্য সমস্যা। চিকিৎসা বিজ্ঞানের পরিভাষায় একে অ্যাপথাস
আলসার (Aphthous Ulcer) বলা হলেও সাধারণ মানুষের কাছে এটি ‘মুখের ঘা’ হিসেবে পরিচিত। এই
সমস্যাটি দেখতে ছোট মনে হলেও এর যন্ত্রণার কারণে স্বাভাবিকভাবে খাওয়া-দাওয়া, কথা বলা, এমনকি একটু
পানি পান করাও প্রায় অসম্ভব হয়ে পড়ে।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (WHO) এবং বৈশ্বিক জনস্বাস্থ্য সমীক্ষা অনুযায়ী, পৃথিবীর মোট
জনসংখ্যার প্রায় ৪% থেকে ২৫% মানুষ তাদের জীবনের কোনো না কোনো পর্যায়ে এই বেদনাদায়ক
অ্যাপথাস আলসারে আক্রান্ত হন। বাংলাদেশ এবং ভারতীয় উপমহাদেশে এই হার তুলনামূলকভাবে বেশি। এর প্রধান
কারণ আমাদের অতিরিক্ত ঝাল-মশলাযুক্ত খাদ্যাভ্যাস, পুষ্টিহীনতা এবং মুখের যত্নে অসচেতনতা।
স্থানীয় বিভিন্ন সমীক্ষায় দেখা যায়, ডায়াবেটিস বা অন্যান্য দীর্ঘস্থায়ী রোগে আক্রান্ত রোগীদের
মধ্যে এবং অতিরিক্ত মানসিক চাপে থাকা তরুণদের মাঝে এই ক্ষতের প্রকোপ প্রায় ৪৭% পর্যন্ত পৌঁছাতে
পারে। অধিকাংশ ক্ষেত্রে মুখের সাধারণ আলসার বা ঘা ১ থেকে ২ সপ্তাহের মধ্যে নিজে নিজেই সেরে যায়।
তবে কিছু কিছু আলসার দীর্ঘস্থায়ী রূপ নিতে পারে, যা ওরাল ক্যান্সারের মতো মারাত্মক রোগের প্রাথমিক
সংকেত বহন করে।
বাংলাদেশের অন্যতম শীর্ষস্থানীয় নাক, কান ও গলা
(ENT) বিশেষজ্ঞ এবং হেড-নেক সার্জন প্রফেসর ডাঃ কামরুল হাসান তরফদার-এর দীর্ঘ চার দশকেরও বেশি সময়ের
চিকিৎসা অভিজ্ঞতা ও পরামর্শের আলোকে মুখের আলসারের কারণ, লক্ষণ, আধুনিক চিকিৎসা এবং করণীয় সম্পর্কে
আজকের এই ব্লগে বিস্তারিত আলোচনা করা হলো।
মুখের আলসার হলো মুখের ভেতরের আস্তরণ বা শ্লেষ্মা ঝিল্লির (Mucous Membrane) একটি বিশেষ ক্ষত।
সাধারণত এই ক্ষতগুলো গোলাকার বা ডিম্বাকৃতির হয়, যার মাঝখানের অংশটি সাদা বা হালকা হলুদ এবং চারপাশ
লালচে রঙের রিং দ্বারা ঘেরা থাকে। বেশিরভাগ আলসার ১ থেকে ২ সপ্তাহের মধ্যে নিজে নিজেই ভালো হয়ে
যায়,
তবে কিছু আলসার দীর্ঘস্থায়ী রূপ নিতে পারে যা গুরুতর রোগের পূর্বলক্ষণ।
অনেক সময় ঘা ওঠার আগে ওই জায়গায় জ্বালা বা ঝিনঝিন অনুভূতি হয়। পরে খাওয়া বা কথা বলার সময় ব্যথা
বাড়তে পারে। তবে মুখের সব ঘা একই কারণে হয় না। তাই শুধু দেখতে কেমন, তা দেখে নিজে নিজে রোগ
নির্ণয় করা ঠিক নয়।
মুখের আলসার কেন হয়? প্রধান কারণ সমূহ
সাধারণত একটি ছোট মুখের আলসারের পেছনে নির্দিষ্ট কারণ বোঝা কঠিন হতে পারে। অনেক ক্ষেত্রে মুখের
ভেতরের আবরণে আঘাত বা জ্বালা থেকে ঘা হয়। আবার কিছু মানুষের ক্ষেত্রে কয়েকটি বিষয় একসঙ্গে কাজ
করে। প্রফেসর ডাঃ কামরুল হাসান তরফদার-এর মতে, মুখের আলসার কোনো
নির্দিষ্ট একটি কারণে হয় না। এর পেছনে অনেকগুলো অভ্যন্তরীণ ও বাহ্যিক কারণ জড়িত থাকে:
১. মেকানিক্যাল বা স্থানীয় আঘাত
আমাদের অসচেতনতার কারণে মুখের ভেতরে লাগা আঘাত আলসারের সবচেয়ে সাধারণ কারণ। দাঁত ব্রাশ করার সময়
অসাবধানতা, শক্ত ব্রাশের ঘর্ষণ কিংবা খাবার চিবানোর সময় নিজের দাঁতে নিজে কামড় লাগার ফলে মুখের
নরম
টিস্যু ক্ষতিগ্রস্ত হয়ে সহজেই এই বেদনাদায়ক ক্ষতের সৃষ্টি হয়।
দাঁতের কামড়: খাবার চিবানোর সময় অসাবধানতাবশত গালের ভেতরের অংশ বা জিহ্বায় নিজের
দাঁতের কামড় লাগা।
ব্রাশের আঘাত: শক্ত ব্রিসলযুক্ত (Hard Bristle) টুথব্রাশ ব্যবহার করে অতিরিক্ত জোরে বা
তাড়াহুড়ো করে দাঁত মাজার সময় মাড়িতে আঘাত লাগা।
দাঁতের ব্রেস ও ডেনচার: আঁকাবাঁকা দাঁত সোজা করার জন্য ব্যবহৃত মেটাল ব্রেস (Braces)
কিংবা বয়স্কদের কৃত্রিম দাঁতের পাটি (Denture) যদি মুখের ভেতর সঠিকভাবে ফিট না হয়, তবে তার
অনবরত ঘর্ষণে ক্ষত সৃষ্টি হয়।
ধারালো দাঁত: মুখের কোনো দাঁত ভেঙে গিয়ে ধারালো হয়ে থাকলে তা অনবরত গাল বা জিহ্বাকে
রক্তাক্ত করতে পারে।
২. পুষ্টির অভাব এবং ভিটামিনের ঘাটতি
বাঙালিদের খাদ্যাভ্যাসে সুষম পুষ্টির অভাব মুখের আলসারের একটি বড় কারণ। রক্তে নির্দিষ্ট কিছু
ভিটামিন এবং খনিজের অভাব হলে মুখের কোষ পুনর্গঠন প্রক্রিয়া ব্যাহত হয়:
ভিটামিন বি-কমপ্লেক্স: বিশেষ করে ভিটামিন বি-১২ (Cyanocobalamin) এবং ফলিক অ্যাসিডের
(Vitamin B9) তীব্র ঘাটতি।
আয়রনের অভাব: রক্তস্বল্পতা বা অ্যানিমিয়া থাকলে মুখের চামড়া পাতলা ও সংবেদনশীল হয়ে
পড়ে।
জিংকের ঘাটতি: শরীরে জিংকের পরিমাণ কমে গেলে ক্ষত নিরাময় ক্ষমতা হ্রাস পায়।
৩. তীব্র মানসিক চাপ এবং অনিদ্রা
চিকিৎসা গবেষণায় দেখা গেছে, মানসিক স্বাস্থ্যের সাথে মুখের ঘায়ের একটি সরাসরি সম্পর্ক রয়েছে।
অতিরিক্ত কাজের চাপ, পরীক্ষার দুশ্চিন্তা, পারিবারিক বা মানসিক অশান্তির সময় আমাদের শরীরে কর্টিসল
(Cortisol) নামক স্ট্রেস হরমোন নিঃসৃত হয়। এই হরমোন শরীরের স্বাভাবিক রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা
সাময়িকভাবে কমিয়ে দেয়, যার ফলে মুখের নরম টিস্যু সহজেই ক্ষতিগ্রস্ত হয়ে আলসার তৈরি করে। একই
সাথে রাতে পর্যাপ্ত ঘুম না হওয়া বা অনিদ্রাও এই সমস্যাকে বহুগুণ বাড়িয়ে দেয়।
৪. টুথপেস্টে ক্ষতিকর রাসায়নিকের ব্যবহার
বাজারের অনেক সস্তা বা নিম্নমানের টুথপেস্ট এবং মাউথওয়াশে ফেনা তৈরির জন্য সোডিয়াম লরিল সালফেট
(Sodium Lauryl Sulfate - SLS) নামক কেমিক্যাল ব্যবহার করা হয়। এই রাসায়নিক উপাদানটি
মুখের ভেতরের অত্যন্ত নরম ও সংবেদনশীল আস্তরণকে শুষ্ক করে ফেলে এবং সুরক্ষামূলক স্তরটি নষ্ট করে
দেয়, যা সহজেই আলসার বা ঘা তৈরি করে।
৫. খাদ্যের সংবেদনশীলতা ও এলার্জি
অতিরিক্ত টক, ঝাল বা মসলাযুক্ত খাবার মুখের ভেতরের সংবেদনশীল টিস্যুতে সরাসরি প্রদাহ তৈরি করে, যা
খুব দ্রুত বেদনাদায়ক ঘায়ে রূপ নেয়। কিছু নির্দিষ্ট খাবার খাওয়ার পর অনেকের মুখে তাৎক্ষণিকভাবে
আলসার দেখা দিতে পারে:
অতিরিক্ত অম্লীয় বা অ্যাসিডিক ফল (যেমন: লেবু, আনারস, টমেটো, কমলা)।
অতিরিক্ত ঝাল, গরম, তেলে ভাজা এবং গরম মশলাযুক্ত স্ট্রিট ফুড।
চকলেট, কফি কিংবা বাদামে থাকা কিছু উপাদানের প্রতি মুখের ভেতরের টিস্যুর সংবেদনশীলতা।
৬. দীর্ঘস্থায়ী রোগ এবং শারীরিক জটিলতা
শরীরের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা কমে গেলে কিংবা লিভার, রক্ত বা পরিপাকতন্ত্রে বড় কোনো জটিলতা তৈরি হলে
তার প্রথম প্রকাশ ঘটে মুখের এই দীর্ঘস্থায়ী ঘায়ের মাধ্যমে। কিছু ক্ষেত্রে মুখের ঘা কেবল মুখের
সমস্যা নয়, বরং শরীরের ভেতরের বড় কোনো রোগের লক্ষণ হিসেবে দেখা দেয়:
হরমোনের পরিবর্তন: নারীদের ক্ষেত্রে পিরিয়ড বা মাসিকের সময় হরমোনের দ্রুত ওঠানামার
কারণে মুখে প্রায়ই ঘা হয়।
পাকস্থলী ও অন্ত্রের রোগ: ক্রোনস ডিজিজ (Crohn's Disease), আলসারেটিভ কোলাইটিস বা
সিলিয়াক ডিজিজের মতো পেটের দীর্ঘস্থায়ী রোগের কারণে পুষ্টি শোষণ ব্যাহত হয়, যার ফলে মুখে
আলসার হয়।
রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতার ঘাটতি: এইচআইভি (HIV) বা ক্যান্সারের কেমোথেরাপি নেওয়ার কারণে
ইমিউনিটি সিস্টেম একদম দুর্বল হয়ে পড়লে।
অনিয়ন্ত্রিত ডায়াবেটিস: রক্তে শর্করার পরিমাণ বেশি থাকলে শরীরের যেকোনো ক্ষত সহজে
শুকাতে চায় না।
মুখের আলসারের সাধারণ লক্ষণসমূহ
সব মুখের ঘা একই রকম হয় না। ঠোঁটের বাইরের দিকে গুচ্ছ গুচ্ছ পানিভরা ফোসকা হলে সেটি সাধারণ অ্যাফথাস
আলসার নাও হতে পারে। মুখের ভেতরের সাধারণ অ্যাফথাস আলসার সাধারণত ছোঁয়াচে নয়; কিন্তু ঠোঁটের
বাইরের ফোসকা অন্য ধরনের সংক্রমণের কারণে হতে পারে। তাই ঘা ছড়ালে, চেহারায় অস্বাভাবিক পরিবর্তন
থাকলে অথবা মুখের আলসারের সঙ্গে গলার
সমস্যা থাকলে চিকিৎসকের পরামর্শ নিন।
অধিকাংশ মানুষই মুখের ঘায়ের লক্ষণ সম্পর্কে অবগত, তবে তীব্রতার ওপর ভিত্তি করে এর লক্ষণগুলো
পরিবর্তিত হতে পারে:
মুখের ভেতরে গোল বা ডিম্বাকার সাদা কিংবা হলদে ঘা
ঘাটির চারপাশে লালচে ভাব
ঘা ওঠার আগে জ্বালা বা ঝিনঝিন অনুভূতি
খাওয়া, পানি পান বা কথা বলার সময় ব্যথা
একসঙ্গে একাধিক ঘা হওয়া
ঝাল, টক বা গরম খাবারে জ্বালা বেড়ে যাওয়া
মুখের আলসারের প্রকারভেদ
মুখের আলসার বা ঘা সবার ক্ষেত্রে একরকম হয় না; এর আকার, গভীরতা এবং তীব্রতার ওপর ভিত্তি করে
চিকিৎসার
ধরনও বদলে যায়। ক্ষতের গঠন ও স্থায়িত্ব বিবেচনা করে সাধারণত মুখের আলসারকে তিনটি প্রধান ভাগে ভাগ
করা হয়:
১. মাইনর আলসার (Minor Ulcer): এটি সবচেয়ে বেশি দেখা যায় (প্রায় ৮০% ক্ষেত্রে)। এগুলো
আকারে ছোট (২ থেকে ৮ মিলিমিটার) হয় এবং কোনো দাগ না রেখেই ১০ থেকে ১৪ দিনের মধ্যে সম্পূর্ণ ভালো
হয়ে যায়।
২. মেজর আলসার (Major Ulcer): এগুলো আকারে বেশ বড় (১ সেন্টিমিটারের বেশি) এবং গভীর হয়। এই
জাতীয় ঘা শুকাতে কয়েক সপ্তাহ থেকে কয়েক মাস পর্যন্ত সময় লাগতে পারে এবং সেরে যাওয়ার পর মুখের
ভেতর স্থায়ী দাগ (Scar) রেখে যায়।
৩. হারপেটিফর্ম আলসার (Herpetiform Ulcer): এগুলো আকারে পিনের মাথার মতো অত্যন্ত ছোট ছোট হয়,
তবে একসাথে অনেকগুলো (১০ থেকে ১০০টি পর্যন্ত) গুচ্ছ আকারে দেখা দেয়।
বাংলাদেশে মুখের আলসারের আধুনিক চিকিৎসা
সাধারণ ছোট আলসারের জন্য অনেক সময় আলাদা চিকিৎসা লাগে না; ঘা নিজে থেকেই সেরে যায়। ব্যথা বেশি হলে
বা ঘা বড় হলে চিকিৎসক কিংবা ফার্মাসিস্টের পরামর্শে উপযুক্ত জেল, মাউথওয়াশ বা ব্যথা কমানোর
ব্যবস্থা নেওয়া যেতে পারে। প্রফেসর ডাঃ কামরুল হাসান তরফদার-এর মতে, সাধারণ মুখের আলসারের জন্য অনেক সময় কোনো ওষুধের
প্রয়োজন হয় না। মুখের
আলসারের চিকিৎসার জন্য ব্যথা উপশম এবং দ্রুত নিরাময়ের জন্য নিচের পদ্ধতিগুলো অনুসরণ করা
হয়:
১. টপিক্যাল থেরাপি (সরাসরি ব্যবহারের ওষুধ)
মুখের ক্ষতের ওপর সরাসরি এই ওষুধগুলো ব্যবহার করা হয়। মূলত আলসারের তীব্র ব্যথা ও জ্বালাপোড়া দ্রুত
কমিয়ে আনতে এবং ক্ষতস্থানকে সুরক্ষিত রাখতে চিকিৎসকেরা এই ওরাল পেস্ট বা জেলগুলো দিয়ে থাকেন।
ওরাল জেল ও পেস্ট: ক্ষতের তীব্র ব্যথা তাৎক্ষণিকভাবে উপশম করার জন্য বেনজোকেইন
(Benzocaine) বা লিডোকেন (Lidocaine) যুক্ত লোকাল অ্যানেস্থেটিক জেল ব্যবহার করা হয়।
কর্টিকোস্টেরয়েড ওয়েনমেন্ট: ট্রায়ামসিনোলোন অ্যাসিটোনাইড (Triamcinolone Acetonide)
যুক্ত ওরাল পেস্ট ক্ষতের প্রদাহ ও ফোলা ভাব দ্রুত কমিয়ে আনে।
২. মেডিকেটেড মাউথওয়াশ
মুখের ক্ষতে যেন নতুন করে কোনো ব্যাকটেরিয়ার সংক্রমণ বা ইনফেকশন না ছড়ায়, সেজন্য মাউথওয়াশ
ব্যবহার
করা হয়। এটি মুখের ভেতরের পরিবেশকে জীবাণুমুক্ত ও পরিষ্কার রাখতে সাহায্য করে।
ক্লোরহেক্সিডিন মাউথওয়াশ: মুখের ক্ষতে যাতে নতুন করে ব্যাকটেরিয়ার সংক্রমণ বা ইনফেকশন
না হয়, সেজন্য চিকিৎসকেরা ০.২% ক্লোরহেক্সিডিন গ্লুকোনেট যুক্ত মাউথওয়াশ দিয়ে দিনে ২-৩ বার
মুখ ধোয়ার পরামর্শ দেন।
মাউথওয়াশ ব্যবহারের সঠিক নিয়ম ও সতর্কতা: ক্লোরহেক্সিডিন মাউথওয়াশ ব্যবহারের পর অন্তত
৩০ মিনিট কোনো কিছু খাওয়া বা পানি পান করা থেকে বিরত থাকতে হবে। এছাড়া, চিকিৎসকের পরামর্শ
ছাড়া
এটি টানা ২ সপ্তাহের বেশি ব্যবহার করা উচিত নয়, কারণ এতে দাঁতে সাময়িক কালচে দাগ পড়তে পারে।
৩. সিস্টেমিক চিকিৎসা ও সাপ্লিমেন্ট
যখন শরীরের ভেতরের পুষ্টির ঘাটতি বা দুর্বল রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতার কারণে মুখে বারবার আলসার হয়, তখন
এই
চিকিৎসা দেওয়া হয়। ঘাটতি পূরণে চিকিৎসকেরা মুখে খাওয়ার ওষুধ বা ভিটামিন সাপ্লিমেন্ট দিয়ে থাকেন।
মাল্টিভিটামিন: শরীরের ঘাটতি পূরণের জন্য চিকিৎসকের ব্যবস্থাপত্র অনুযায়ী ভিটামিন
বি-কমপ্লেক্স, জিংক সালফেট এবং ফলিক অ্যাসিডের ট্যাবলেট ১ থেকে ২ সপ্তাহ খেতে হতে পারে।
ব্যথানাশক: ব্যথার তীব্রতা অসহ্য হলে সাময়িকভাবে প্যারাসিটামল বা মৃদু ব্যথানাশক ওষুধ
দেওয়া হয়।
কখন দ্রুত চিকিৎসকের পরামর্শ নেবেন?
মুখের আলসার তিন সপ্তাহেও না সারলে চিকিৎসক বা দন্তচিকিৎসককে দেখান। বিশেষ করে তিন সপ্তাহের বেশি
থাকা ঘা পরীক্ষা করানো জরুরি। দীর্ঘস্থায়ী ঘা বেশিরভাগ সময় গুরুতর কিছু না হলেও, বিরল ক্ষেত্রে
এটি মুখের ক্যানসারের লক্ষণ হতে পারে। তাই দেরি না করে পরীক্ষা করান। পানিশূন্যতার লক্ষণ দেখা দিলে
বা একেবারেই পানি পান করতে না পারলে দ্রুত চিকিৎসা নিন। দ্রুত পরামর্শ নিন যদি ঘাটি:
স্বাভাবিকের তুলনায় বড়, গভীর বা খুব ব্যথাযুক্ত হয়
বারবার ফিরে আসে, অথবা পুরোনো ঘা সারার আগেই নতুন ঘা ওঠে
সহজে রক্তপাত করে বা ক্রমে লাল ও ব্যথাযুক্ত হয়ে ওঠে
গিলতে বা খেতে সমস্যা করে
জ্বরের সঙ্গে দেখা দেয়
শরীরের অন্য কোথাও ঘা, জয়েন্টে ব্যথা বা অন্য অস্বাভাবিক উপসর্গের সঙ্গে থাকে
মুখের আলসার প্রতিরোধে করণীয় এবং জীবনযাত্রার পরিবর্তন
সব আলসার ঠেকানো যায় না। তবে মুখে আঘাত ও জ্বালা কমিয়ে ঝুঁকি কিছুটা কমানো যেতে পারে। বারবার ঘা
হলে শুধু খাবার বদলানো বা ভিটামিন খাওয়ার ওপর নির্ভর না করে কারণটি যাচাই করান।আপনার যদি প্রায়শই
মুখে ঘা হওয়ার প্রবণতা থাকে, তবে জীবনযাত্রায় কিছু সাধারণ পরিবর্তন এনে এবং ঘরোয়া উপায়ে এর
তীব্রতা অনেকটাই নিয়ন্ত্রণ করতে পারেন:
লবণ-পানির কুলকুচি: ১ গ্লাস কুসুম গরম পানিতে আধা চামচ লবণ মিশিয়ে মুখে ৩০ সেকেন্ড ধরে
রেখে কুলকুচি করুন। দিনে ৩ থেকে ৪ বার এটি করলে লবণ পানি প্রাকৃতিক অ্যান্টিসেপটিক হিসেবে কাজ
করে ক্ষতের ফোলা ভাব ও ব্যাকটেরিয়া কমিয়ে দেয়।
খাঁটি মধুর ব্যবহার: মধু একটি চমৎকার প্রাকৃতিক নিরাময়কারী উপাদান। মুখের আলসারের ওপর
দিনে কয়েকবার খাঁটি মধু লাগিয়ে রাখলে ক্ষত দ্রুত শুকায় এবং জ্বালাপোড়া কমে।
নারকেল তেল: আলসারের ওপর সামান্য বিশুদ্ধ নারকেল তেল আলতো করে লাগিয়ে দিলে তা মুখের
ভেতরের টিস্যুর ওপর একটি সুরক্ষামূলক স্তর তৈরি করে, যা খাবারের ঘর্ষণ থেকে ক্ষতকে রক্ষা করে।
যথাযথ টুথব্রাশ নির্বাচন: সর্বদা নরম ব্রিসলযুক্ত (Soft বা Ultra-Soft) টুথব্রাশ ব্যবহার
করুন। প্রতি ৩ মাস পর পর ব্রাশ পরিবর্তন করুন। দাঁত মাজার সময় বাড়তি চাপ দেওয়া বন্ধ করুন।
খাবারে নিষেধাজ্ঞা: মুখে ঘা থাকা অবস্থায় কাঁচা মরিচ, গরম তরকারি, ফাস্টফুড, চিপস, এবং
টক জাতীয় ফল খাওয়া সম্পূর্ণ বন্ধ রাখুন। ঠান্ডা বা স্বাভাবিক তাপমাত্রার নরম খাবার যেমন- জাউ
ভাত, দই, ওটস ইত্যাদি খান।
পর্যাপ্ত পানি ও সুষম খাদ্য: দৈনিক অন্তত আড়াই থেকে তিন লিটার পানি পান করুন যাতে মুখ
শুষ্ক না হয়ে যায়। প্রতিদিনের খাদ্যতালিকায় সবুজ শাকসবজি, ডিম, দুধ এবং লিভারের মতো পুষ্টিকর
খাবার রাখুন।
ওরাল ক্যান্সার নাকি সাধারণ আলসার? বুঝবেন কিভাবে
প্রফেসর ডাঃ কামরুল হাসান তরফদার অত্যন্ত গুরুত্বের সাথে সতর্ক করে বলেন, "সব মুখের ঘা কিন্তু সাধারণ অ্যাপথাস
আলসার নয়।" আমাদের দেশে জর্দা, গুল, তামাক পাতা, সুপারি ও পান খাওয়ার ব্যাপক প্রচলন
রয়েছে।
এই অভ্যাসের কারণে মুখের দীর্ঘস্থায়ী ঘা ওরাল ক্যান্সারে (Oral Cancer) রূপ নেওয়ার ঝুঁকি বহুণ
বেড়ে
যায়। মুখে ঘা হলে সেটি সাধারণ আলসার নাকি ক্যান্সারের লক্ষণ, তা বোঝার প্রধান পার্থক্যগুলো নিচে
দেওয়া হলো:
ব্যথার অনুভূতি: সাধারণ আলসার বা মুখের ঘায়ে প্রচণ্ড ব্যথা এবং জ্বালাপোড়া থাকে, বিশেষ
করে খাবার খাওয়ার সময়। কিন্তু ওরাল ক্যান্সারের প্রাথমিক ঘাটি সাধারণত সম্পূর্ণ
ব্যথাহীন
হয়, কোনো কামড় বা অস্বস্তি ছাড়াই এটি মুখে অবস্থান করে।
স্থায়িত্ব ও সময়কাল: সাধারণ মুখের ঘা সর্বোচ্চ ১ থেকে ২ সপ্তাহের মধ্যে কোনো চিকিৎসা
ছাড়াই নিজে নিজে ভালো হতে শুরু করে। অপরদিকে, ক্যান্সারের ক্ষতটি ৩ থেকে ৪ সপ্তাহ বা তার বেশি
সময় পার হলেও একটুও শুকায় না।
ক্ষতের আকার ও গঠন: সাধারণ ঘা আকারে ছোট ও নির্দিষ্ট বৃত্তাকার থাকে। কিন্তু ক্যান্সারের
ঘা দিন দিন আকারে বড় হতে থাকে, এর চারপাশের বর্ডার বা চামড়া শক্ত হয়ে যায় এবং ক্ষতের গভীরতা
বাড়তে থাকে।
রক্তপাত ও অন্যান্য লক্ষণ: সাধারণ ঘা থেকে সাধারণত নিজে থেকে রক্ত পড়ে না। কিন্তু
ক্যান্সারের ক্ষতস্থান থেকে অনেক সময় কোনো কারণ ছাড়াই হুট করে রক্তপাত হতে পারে এবং এর সাথে
গলার লিম্ফ নোড বা গ্রন্থি ফুলে শক্ত হয়ে যেতে পারে।
নোট:
মুখে কোনো ব্যথাহীন বা দীর্ঘস্থায়ী ঘা দেখা দিলে অবহেলা না করে অনতিবিলম্বে একজন ইএনটি
বিশেষজ্ঞ বা ওরাল সার্জনের পরামর্শ নিয়ে বায়োপসি (Biopsy) বা মাংস পরীক্ষা করানো জরুরি।
প্রাথমিক অবস্থায় ওরাল ক্যান্সার শনাক্ত হলে তা আধুনিক চিকিৎসার মাধ্যমে সম্পূর্ণ নিরাময় সম্ভব।
মুখের আলসারে প্রফেসর ডাঃ কামরুল হাসান তরফদার এর পরামর্শ নিন
আপনার বা আপনার পরিবারের কারো কি মুখের আলসার বা ঘা দীর্ঘ সময় ধরে ভুগাচ্ছে? কিংবা মুখে বারবার ঘা
হওয়ার সমস্যায় ভুগছেন? সঠিক রোগ নির্ণয় এবং উন্নত চিকিৎসার জন্য দেশের প্রখ্যাত ও অভিজ্ঞ ইএনটি
বিশেষজ্ঞ প্রফেসর ডাঃ কামরুল হাসান তরফদার-এর সরাসরি পরামর্শ নিতে পারেন।
মুখের ঘা দীর্ঘদিন না সারলে, বারবার হলে বা গিলতে অসুবিধা
হলে
কারণটি পরীক্ষা করানো জরুরি। তাঁর ডিগ্রির মধ্যে MBBS, FCPS, FICS, FACS ও FRCS (England) রয়েছে,
এবং তিনি ৪০ বছরের বেশি সময় ধরে ENT ও হেড-নেক চিকিৎসাসেবায় কাজ করছেন। আপনার উপসর্গ
অনুযায়ী পরীক্ষা ও পরামর্শের জন্য তাঁর সঙ্গে যোগাযোগ করতে পারেন।
মুখের আলসার বা মুখের ঘা আমাদের শরীরের ভেতরের পুষ্টিহীনতা, ক্লান্তি কিংবা অনিয়ন্ত্রিত জীবনযাত্রার
একটি অ্যালার্ম বা সতর্ক সংকেত। সঠিক সময়ে পুষ্টিকর খাবার গ্রহণ, মুখের সঠিক যত্ন এবং মানসিক
চাপমুক্ত থাকার মাধ্যমে এই সমস্যা থেকে দূরে থাকা সম্ভব। তবে যেকোনো দীর্ঘস্থায়ী ক্ষতের ক্ষেত্রে
অবহেলা না করে বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের পরামর্শ নিন, সুস্থ থাকুন।
মুখের আলসার সাধারণত কেন হয়, কীভাবে ব্যথা কমানো যায় এবং কখন চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া উচিত—এসব
নিয়ে অনেকের প্রশ্ন থাকে। নিচে মুখের ঘা সম্পর্কিত কিছু সাধারণ প্রশ্নের উত্তর দেওয়া হলো।
কোন ভিটামিনের অভাবে মুখে ঘা বা আলসার সবচেয়ে বেশি হয়?
মুখের আলসার বা ঘা হওয়ার পেছনে মূলত ভিটামিন বি-১২ (B12), ফলিক অ্যাসিড বা ভিটামিন বি-৯
এবং আয়রনের অভাব সবচেয়ে বেশি দায়ী। শরীরে এই উপাদানগুলোর ঘাটতি হলে মুখের ভেতরের
কোষের স্বাভাবিক বৃদ্ধি ব্যাহত হয়।
মুখের আলসার কি ছোঁয়াচে? চুমু খেলে বা একই গ্লাসে পানি খেলে কি এটি
ছড়ায়?
না, সাধারণ অ্যাপথাস আলসার বা মুখের ঘা একেবারেই ছোঁয়াচে নয়। এটি কোনো ব্যাকটেরিয়া বা
ভাইরাসের প্রত্যক্ষ ছোঁয়াচে সংক্রমণ নয়, তাই আক্রান্ত ব্যক্তির সাথে খাবার শেয়ার
করলে বা চুমু খেলে এটি অন্য কারো শরীরে ছড়ায় না।
টুথপেস্ট পরিবর্তন করলে কি মুখের আলসার কমে যেতে পারে?
হ্যাঁ, অবশ্যই। আপনার টুথপেস্টে যদি ‘সোডিয়াম লরিল সালফেট’ (SLS) থাকে, তবে তা মুখের
চামড়াকে ক্ষতিগ্রস্ত করে। এসএলএস-মুক্ত (SLS-free) বা ভেষজ মৃদু টুথপেস্ট ব্যবহার শুরু
করলে বারবার আলসার হওয়ার প্রবণতা অনেকাংশে কমে যায়।
মুখের আলসার ভালো করার সবচেয়ে দ্রুততম ঘরোয়া উপায় কী?
সবচেয়ে দ্রুত এবং কার্যকর ঘরোয়া উপায় হলো দিনে ৩-৪ বার কুসুম গরম পানিতে লবণ মিশিয়ে
কুলকুচি করা। এর পাশাপাশি ক্ষতের ওপর সরাসরি খাঁটি মধু বা নারকেল তেল লাগিয়ে রাখলে
ব্যথা এবং জ্বালাপোড়া খুব দ্রুত কমে আসে।
মুখের ঘা কতদিন থাকলে ডাক্তারের কাছে যাওয়া উচিত?
যদি মুখের আলসার বা ঘা কোনো কারণ ছাড়াই ৩ সপ্তাহের (২১ দিন) বেশি সময় ধরে
স্থায়ী হয়, ওষুধ ব্যবহারের পরও না সারে এবং ক্ষতটি ব্যথাহীন হয়, তবে আর এক মুহূর্তও
দেরি না করে একজন নাক, কান ও গলা বিশেষজ্ঞ বা ডেন্টিস্টের কাছে যাওয়া উচিত।
পানের সাথে জর্দা বা গুল খেলে কি মুখের আলসার হয়?
হ্যাঁ। জর্দা, গুল এবং সাদা পাতায় উচ্চ মাত্রার ক্ষতিকর রাসায়নিক ও নিকোটিন থাকে, যা
মুখের ভেতরের নরম টিস্যুকে পুড়িয়ে ফেলে এবং স্থায়ী ক্ষতের সৃষ্টি করে। এই অভ্যাস
ওরাল ক্যান্সারের প্রধান কারণ।
মুখের আলসারের চিকিৎসা করতে!
আজই প্রফেসর ডাঃ কামরুল হাসান তরফদার-এর সাথে যোগাযোগ করুন।
সতর্কতাঃ
ওয়েবসাইটে প্রকাশিত তথ্যসমূহ শুধুমাত্র সচেতনতা ও শিক্ষামূলক উদ্দেশ্যে প্রকাশিত। এটি কোনোভাবেই চিকিৎসা পরামর্শের বিকল্প নয়। চিকিৎসা সংক্রান্ত যেকোনো সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে অবশ্যই একজন বিশেষজ্ঞ ডাক্তারের পরামর্শ গ্রহণ করুন।
Throat treatment in Bangladesh for pain, infection, and voice issues. Get expert ENT care from Prof. Dr. Kamrul Hassan Tarafder to ensure a safe recovery.
Looking for mouth ulcer treatment in Bangladesh? Consult Prof. Dr. Kamrul Hassan Tarafder for recurrent, painful or persistent oral ulcers. Call 01823-025305