গলার ক্যান্সার: লক্ষণ, কারণ, রোগ নির্ণয় এবং চিকিৎসা

গলার ক্যান্সার বলতে আসলে একটি নির্দিষ্ট রোগকে বোঝায় না। এটি গলার বিভিন্ন অংশে তৈরি হওয়া কয়েক ধরনের ক্যান্সারের সাধারণ নাম। ক্যান্সার স্বরযন্ত্র, গলবিলের মাঝের অংশ বা গলার অন্য কোনো অংশ থেকে শুরু হতে পারে। কোথায় ক্যান্সার হয়েছে তার ওপর লক্ষণ ও চিকিৎসা দুটোই বদলে যায়। গলা ভাঙা, খাবার গিলতে কষ্ট বা দীর্ঘদিন গলা ব্যথা—এ ধরনের সমস্যা বেশিরভাগ সময় সাধারণ কোনো কারণেই হয়।

গলার ক্যান্সারের লক্ষণ, কারণ, রোগ নির্ণয় এবং চিকিৎসা

দীর্ঘদিন গলা ব্যথা, কণ্ঠস্বর ভেঙে যাওয়া, খাবার গিলতে কষ্ট বা ঘাড়ে চাকা—এসব গলার ক্যান্সারের সম্ভাব্য লক্ষণ হতে পারে। তবে একই সমস্যা সাধারণ গলার রোগেও দেখা যায়। তাই উপসর্গ কয়েক সপ্তাহেও না কমলে নাক-কান-গলা বিশেষজ্ঞের পরামর্শ নেওয়া উচিত।

গলার ক্যান্সার ধরা পড়লে চিকিৎসা নির্ভর করে ক্যান্সারের ধরন, অবস্থান, আকার এবং কতটা ছড়িয়েছে তার ওপর। প্রয়োজন অনুযায়ী অস্ত্রোপচার, রেডিওথেরাপি, কেমোথেরাপি বা একাধিক চিকিৎসা একসঙ্গে দেওয়া হতে পারে। রোগটি যত আগে শনাক্ত হয়, অনেক ক্ষেত্রে চিকিৎসার সুযোগ তত ভালো থাকে।

ডাক্তারের পরামর্শ নিন Diagonal arrow Icon

গলার ক্যান্সার কী?

গলার কোনো অংশের কোষ অস্বাভাবিকভাবে ও নিয়ন্ত্রণহীনভাবে বাড়তে থাকলে সেখানে ক্যান্সার তৈরি হতে পারে। এই অস্বাভাবিক কোষ একসময় টিউমার তৈরি করতে পারে এবং চিকিৎসা না হলে আশপাশের টিস্যু, লসিকাগ্রন্থি বা শরীরের অন্য অংশে ছড়িয়ে যেতে পারে।

তবে “গলার ক্যান্সার” কোনো একটি নির্দিষ্ট ক্যান্সারের নাম নয়। সাধারণভাবে গলবিলের বিভিন্ন অংশ এবং স্বরযন্ত্রে হওয়া কয়েক ধরনের ক্যান্সারকে এই নামে বোঝানো হয়। স্বরযন্ত্রের ক্যান্সারকে ল্যারিঞ্জিয়াল ক্যান্সার এবং গলার নিচের অংশের ক্যান্সারকে হাইপোফ্যারিঞ্জিয়াল ক্যান্সার বলা হয়।

গলার এসব ক্যান্সারের বড় একটি অংশ গলার ভেতরের আবরণ তৈরি করা সমতল কোষ থেকে শুরু হয়। এ ধরনের ক্যান্সারকে স্কোয়ামাস সেল কার্সিনোমা বলা হয়।

গলার কোন কোন অংশে ক্যান্সার হতে পারে?

গলা নাকের পেছন থেকে শুরু হয়ে খাদ্যনালি ও শ্বাসনালির কাছাকাছি নিচের দিকে নেমে গেছে। ক্যান্সার ঠিক কোন জায়গা থেকে শুরু হয়েছে, সেটি জানা খুব গুরুত্বপূর্ণ। কারণ জায়গাভেদে লক্ষণ, রোগের আচরণ এবং চিকিৎসা আলাদা হতে পারে।

নাসোফ্যারিঞ্জিয়াল ক্যান্সার

নাকের ঠিক পেছনে গলবিলের যে ওপরের অংশ রয়েছে তাকে নাসোফ্যারিংস বলা হয়। এই অংশে ক্যান্সার হলে তাকে নাসোফ্যারিঞ্জিয়াল ক্যান্সার বলা হয়। শুরুর দিকে ঘাড়ে চাকা, নাক বন্ধ থাকা, নাক দিয়ে রক্ত পড়া, এক কানে শুনতে সমস্যা বা কানে চাপ অনুভূত হওয়ার মতো লক্ষণ থাকতে পারে। এ ধরনের ক্যান্সারের সঙ্গে এপস্টাইন-বার ভাইরাসের (EBV) দীর্ঘস্থায়ী সংক্রমণের সম্পর্ক রয়েছে।

অরোফ্যারিঞ্জিয়াল ক্যান্সার

মুখের পেছনের গলার অংশকে অরোফ্যারিংস বলা হয়। এর মধ্যে টনসিল, জিহ্বার পেছনের অংশ এবং গলার পেছনের দেয়ালের কিছু অংশ রয়েছে। এখানে ক্যান্সার হলে গিলতে ব্যথা, গলায় কিছু আটকে থাকার অনুভূতি, ঘাড়ে চাকা বা এক পাশের কানে ব্যথা হতে পারে। উচ্চঝুঁকির এইচপিভি-১৬ সংক্রমণ বিশেষ করে টনসিল ও জিহ্বার গোড়ার অরোফ্যারিঞ্জিয়াল ক্যান্সারের একটি গুরুত্বপূর্ণ ঝুঁকি।

হাইপোফ্যারিঞ্জিয়াল ক্যান্সার

গলবিলের একেবারে নিচের অংশ, যা খাদ্যনালির দিকে চলে গেছে, সেটি হাইপোফ্যারিংস। এখানে তৈরি হওয়া ক্যান্সারকে হাইপোফ্যারিঞ্জিয়াল ক্যান্সার বলা হয়। এই অংশের ক্যান্সার শুরুতে খুব স্পষ্ট কণ্ঠস্বরের পরিবর্তন নাও করতে পারে। ফলে অনেক সময় গিলতে কষ্ট, গলায় ব্যথা বা ঘাড়ে চাকা দেখা দেওয়ার পর রোগটি ধরা পড়ে।

স্বরযন্ত্রের ক্যান্সার

স্বরযন্ত্র বা ল্যারিংসের ভেতরে আমাদের স্বরতন্ত্রী থাকে। এই অংশে ক্যান্সার হলে তাকে স্বরযন্ত্রের ক্যান্সার বা ল্যারিঞ্জিয়াল ক্যান্সার বলা হয়। স্বরতন্ত্রে ক্যান্সার শুরু হলে অনেক সময় প্রথম দিকেই গলা ভাঙা বা কণ্ঠস্বরের পরিবর্তন দেখা যায়। এ কারণে স্বরতন্ত্রের কিছু ক্যান্সার তুলনামূলক দ্রুত শনাক্ত হওয়ার সুযোগ থাকে। স্বরযন্ত্রকে সাধারণভাবে তিন ভাগে দেখা হয়।

  1. সুপ্রাগ্লটিস: স্বরতন্ত্রের ওপরের অংশ।
  2. গ্লটিস: মূল স্বরতন্ত্রী বা কণ্ঠ তৈরির অংশ।
  3. সাবগ্লটিস: স্বরতন্ত্রের নিচ থেকে শ্বাসনালির দিকে যাওয়া অংশ।

গ্লটিসে ক্যান্সার হলে কণ্ঠস্বর বদলানো তুলনামূলক আগে দেখা দিতে পারে। কিন্তু সুপ্রাগ্লটিস বা সাবগ্লটিসের ক্যান্সারে শুরুতে কণ্ঠস্বরের পরিবর্তন নাও থাকতে পারে।

গলার ক্যান্সারের প্রাথমিক লক্ষণ

গলার ক্যান্সারের শুরুটা সব সময় খুব স্পষ্ট হয় না। অনেক উপসর্গই প্রথমে সাধারণ গলার সমস্যার মতো মনে হতে পারে। বিশেষ করে নিচের লক্ষণগুলো কয়েক সপ্তাহ ধরে থাকলে গুরুত্ব দেওয়া উচিত:

গলার ক্যান্সারের প্রাথমিক লক্ষণ
  • দুই সপ্তাহের বেশি গলা ভাঙা বা কণ্ঠস্বর কর্কশ থাকা
  • স্বাভাবিক কণ্ঠস্বর বদলে যাওয়া
  • গলা ব্যথা সহজে না কমা
  • খাবার বা পানি গিলতে অসুবিধা
  • ঢোক গিললে ব্যথা হওয়া
  • গলায় কিছু আটকে আছে বলে মনে হওয়া
  • ঘাড়ে নতুন চাকা বা ফোলা
  • এক পাশের কানে বারবার বা দীর্ঘদিন ব্যথা
  • দীর্ঘস্থায়ী কাশি

স্বরতন্ত্রের ক্যান্সারে গলা ভাঙা অনেক সময় শুরুর গুরুত্বপূর্ণ লক্ষণ। American Cancer Society দুই সপ্তাহের মধ্যে কণ্ঠস্বরের পরিবর্তন না কমলে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়ার কথা বলেছে।

রোগ বাড়লে কী কী লক্ষণ দেখা দিতে পারে?

ক্যান্সার বড় হলে বা আশপাশের অংশে ছড়িয়ে পড়লে আগের উপসর্গগুলো আরও বাড়তে পারে। তখন খাবার গেলা ক্রমেই কঠিন হয়ে যেতে পারে। কিছু রোগীর শ্বাস নিতেও সমস্যা হয়। অগ্রসর অবস্থায় দেখা দিতে পারে—

  • খুব বেশি গিলতে কষ্ট
  • খাবার গেলার সময় তীব্র ব্যথা
  • শ্বাস নিতে কষ্ট বা শ্বাসের সময় অস্বাভাবিক শব্দ
  • ঘাড়ের চাকা বড় হয়ে যাওয়া
  • কারণ ছাড়া দ্রুত ওজন কমে যাওয়া
  • দুর্বলতা ও খাবারে অনীহা
  • কণ্ঠস্বরের বড় পরিবর্তন
  • কোনো কোনো ক্ষেত্রে কাশির সঙ্গে রক্ত আসা

নোট: শ্বাস নিতে উল্লেখযোগ্য কষ্ট হলে অপেক্ষা না করে দ্রুত চিকিৎসা নেওয়া প্রয়োজন।

গলার ক্যান্সারের কারণ কী?

ক্যান্সার শুরু হয় যখন কোনো কোষের জিনগত উপাদানে এমন পরিবর্তন ঘটে, যার ফলে কোষ স্বাভাবিক নিয়ন্ত্রণের বাইরে বাড়তে থাকে। কিন্তু একজন নির্দিষ্ট মানুষের ক্ষেত্রে ঠিক কেন এই পরিবর্তন ঘটেছে, তা সবসময় বলা সম্ভব হয় না। কিছু অভ্যাস, সংক্রমণ ও পরিবেশগত বিষয় গলার নির্দিষ্ট ক্যান্সারের ঝুঁকি বাড়ায়। এর মধ্যে তামাক ও অতিরিক্ত অ্যালকোহল সবচেয়ে প্রতিষ্ঠিত ঝুঁকির কারণগুলোর মধ্যে রয়েছে।

গলার ক্যান্সারে ঝুঁকির প্রধান কারণসমূহ

গলার ক্যান্সার কেন হয়, তা সব সময় নির্দিষ্ট করে বলা যায় না। তবে কিছু অভ্যাস, ভাইরাসজনিত সংক্রমণ এবং দীর্ঘদিনের পরিবেশগত সংস্পর্শ এই রোগের ঝুঁকি বাড়াতে পারে। ঝুঁকির কারণ থাকা মানেই যে ক্যান্সার হবেই, এমন নয়। তবে নিচের বিষয়গুলো সম্পর্কে সচেতন থাকা জরুরি।

গলার ক্যান্সারে ঝুঁকির প্রধান কারণসমূহ
  • ধূমপান: সিগারেট, বিড়ি ও অন্যান্য তামাকজাত ধোঁয়া গলা ও স্বরযন্ত্রের কোষের ক্ষতি করতে পারে। দীর্ঘদিন ও বেশি পরিমাণে ধূমপান করলে ঝুঁকি আরও বাড়ে।
  • জর্দা, গুল ও তামাকজাত পণ্য: শুধু ধূমপান নয়, মুখে ব্যবহৃত তামাকও ক্ষতিকর। নিয়মিত জর্দা, গুল বা তামাকসহ পান খাওয়ার অভ্যাস মুখ ও গলার কিছু ক্যান্সারের ঝুঁকির সঙ্গে যুক্ত।
  • পান-সুপারি: বাংলাদেশে পান-সুপারি খাওয়ার অভ্যাস বেশ পরিচিত। দীর্ঘদিন নিয়মিত সুপারি খাওয়াও মুখ ও গলবিলের কিছু ক্যান্সারের ঝুঁকি বাড়াতে পারে।
  • অতিরিক্ত অ্যালকোহল গ্রহণ: দীর্ঘদিন বেশি পরিমাণে অ্যালকোহল পান করলে স্বরযন্ত্র ও গলার কিছু অংশের ক্যান্সারের ঝুঁকি বাড়তে পারে। ধূমপান ও অ্যালকোহল একসঙ্গে থাকলে ঝুঁকি আরও বেশি হয়।
  • এইচপিভি সংক্রমণ: হিউম্যান প্যাপিলোমা ভাইরাসের কিছু উচ্চঝুঁকির ধরন, বিশেষ করে এইচপিভি-১৬, টনসিল ও জিহ্বার গোড়ার অরোফ্যারিঞ্জিয়াল ক্যান্সারের সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে সম্পর্কিত।
  • এপস্টাইন-বার ভাইরাস সংক্রমণ: এপস্টাইন-বার ভাইরাস বা ইবিভির সঙ্গে বিশেষ করে নাসোফ্যারিঞ্জিয়াল ক্যান্সারের সম্পর্ক পাওয়া গেছে। তবে এটি সব ধরনের গলার ক্যান্সারের কারণ নয়।
  • বয়স বাড়া: বয়স বাড়ার সঙ্গে গলা ও স্বরযন্ত্রের কিছু ক্যান্সারের ঝুঁকি বাড়তে পারে। তবু কম বয়সেও এসব ক্যান্সার দেখা দিতে পারে।
  • কর্মক্ষেত্রের ধুলা ও রাসায়নিক: কাঠের ধুলা, ধোঁয়া, রং বা নির্দিষ্ট শিল্পকারখানার রাসায়নিকের দীর্ঘদিন সংস্পর্শে থাকলে কিছু মাথা-ঘাড়ের ক্যান্সারের ঝুঁকি বাড়তে পারে।
  • অপুষ্টিকর খাদ্যাভ্যাস: দীর্ঘদিন ফল ও সবজি কম খাওয়া এবং পুষ্টির ঘাটতির সঙ্গে গলার কিছু ক্যান্সারের বাড়তি ঝুঁকির সম্পর্ক পাওয়া গেছে। তবে এটি ধূমপান বা তামাকের মতো প্রধান ঝুঁকির কারণ নয়।

গলার ক্যান্সার কীভাবে নির্ণয় করা হয়?

শুধু গলা দেখে বা লক্ষণ শুনে গলার ক্যান্সার নিশ্চিত করা সম্ভব নয়। সন্দেহ হলে নাক-কান-গলা ও মাথা-ঘাড় বিশেষজ্ঞ কয়েক ধাপে পরীক্ষা করতে পারেন।

রোগীর ইতিহাস ও শারীরিক পরীক্ষা

প্রথমে চিকিৎসক জানতে চান সমস্যা কতদিন ধরে চলছে, ধূমপান বা তামাকের অভ্যাস আছে কি না, খাবার গিলতে সমস্যা হচ্ছে কি না এবং ওজন কমেছে কি না। এরপর মুখ, গলা ও ঘাড় পরীক্ষা করা হয়। ঘাড়ে কোনো চাকা বা লসিকাগ্রন্থি বড় হয়েছে কি না সেটিও দেখা হয়।

ল্যারিংগোস্কোপির মাধ্যমে গলার ভেতর ও স্বরযন্ত্র পরীক্ষা

স্বরযন্ত্র ও গলার গভীর অংশ সরাসরি দেখার জন্য ক্যামেরাযুক্ত সরু যন্ত্র ব্যবহার করা হয়। একে ল্যারিংগোস্কোপি বলা হয়। নমনীয় ক্যামেরা সাধারণত নাক দিয়ে গলার ভেতরের দিকে নেওয়া যায়। এতে স্বরতন্ত্রের নড়াচড়া, ক্ষত, অস্বাভাবিক বৃদ্ধি বা সন্দেহজনক টিউমার আছে কি না দেখা যায়।

বায়োপসির মাধ্যমে ক্যান্সার কোষ নিশ্চিত করা

কোনো জায়গা সন্দেহজনক মনে হলে সেখান থেকে অল্প পরিমাণ টিস্যু সংগ্রহ করে পরীক্ষাগারে দেখা হয়। এটিই বায়োপসি। গলার ক্যান্সার নিশ্চিত করার জন্য টিস্যু পরীক্ষা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। শুধু স্ক্যান বা ক্যামেরায় টিউমারের মতো কিছু দেখলেই সেটিকে ক্যান্সার বলা যায় না।

ঘাড়ের চাকা থেকে সূঁচ দিয়ে কোষ পরীক্ষা

ঘাড়ে সন্দেহজনক চাকা বা লসিকাগ্রন্থি থাকলে পাতলা সূঁচ দিয়ে কোষ সংগ্রহ করা হতে পারে। এই পরীক্ষাকে সাধারণভাবে এফএনএসি বলা হয়। সংগ্রহ করা কোষ পরীক্ষাগারে দেখে ক্যান্সারের উপস্থিতি সম্পর্কে ধারণা পাওয়া যায়।

সিটি স্ক্যানে টিউমারের আকার ও বিস্তার দেখা

সিটি স্ক্যানের মাধ্যমে টিউমারের আকার, সঠিক অবস্থান এবং আশপাশের অংশের সঙ্গে এর সম্পর্ক সম্পর্কে পরিষ্কার ধারণা পাওয়া যায়। একই সঙ্গে ঘাড়ের লসিকাগ্রন্থি বড় হয়েছে কি না বা সেখানে ক্যান্সার ছড়ানোর সন্দেহ আছে কি না তাও দেখা যায়। রোগের পর্যায় নির্ধারণ এবং পরবর্তী চিকিৎসা পরিকল্পনা তৈরিতে এই পরীক্ষা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।

এমআরআই দিয়ে গলার নরম টিস্যু ও আশপাশের অংশ পরীক্ষা

এমআরআই পরীক্ষায় মাথা ও ঘাড়ের নরম টিস্যু, গলার গভীর অংশ এবং টিউমারের আশপাশের গঠন তুলনামূলকভাবে বিস্তারিতভাবে দেখা যায়। ক্যান্সার কাছের পেশি, স্নায়ু বা মাথার খুলির গোড়ার দিকে ছড়িয়েছে কি না বোঝার ক্ষেত্রে এটি বিশেষভাবে কাজে লাগে। নাসোফ্যারিঞ্জিয়াল ক্যান্সার বা গলার গভীর অংশের টিউমারে চিকিৎসক প্রয়োজন অনুযায়ী এমআরআই করার পরামর্শ দিতে পারেন।

পিইটি-সিটির মাধ্যমে ক্যান্সার ছড়িয়ে পড়েছে কি না দেখা

পিইটি-সিটি পরীক্ষায় শরীরের বিভিন্ন অংশে অস্বাভাবিক কোষের কার্যকলাপ একসঙ্গে দেখা যায়। গলার ক্যান্সার ঘাড়ের লসিকাগ্রন্থি বা শরীরের দূরের কোনো অঙ্গে ছড়িয়ে পড়েছে কি না বোঝার জন্য নির্বাচিত রোগীর ক্ষেত্রে এই পরীক্ষা করা হতে পারে। সব রোগীর পিইটি-সিটি প্রয়োজন হয় না; ক্যান্সারের ধরন, পর্যায় এবং আগের পরীক্ষার ফল দেখে চিকিৎসক সিদ্ধান্ত নেন।

প্রয়োজন অনুযায়ী এইচপিভি ও ইবিভি পরীক্ষা

অরোফ্যারিঞ্জিয়াল ক্যান্সারে টিউমারের নমুনায় এইচপিভি-সম্পর্কিত পরীক্ষা গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে। কারণ এইচপিভি-সম্পর্কিত ক্যান্সারের রোগের আচরণ ও পর্যায় নির্ধারণের কিছু বিষয় আলাদা। অন্যদিকে নাসোফ্যারিঞ্জিয়াল ক্যান্সারের ক্ষেত্রে ইবিভি-সংক্রান্ত রক্ত বা টিস্যু পরীক্ষা প্রয়োজন হতে পারে।

গলার ক্যান্সারের বিভিন্ন স্টেজ

ক্যান্সার ধরা পড়ার পর সেটি কোথায় সীমাবদ্ধ আছে এবং কতটা ছড়িয়েছে তা বের করাকে স্টেজ নির্ধারণ বলা হয়। গলার ক্যান্সারের সঠিক স্টেজিং বেশ জটিল। নাসোফ্যারিংস, অরোফ্যারিংস, হাইপোফ্যারিংস ও স্বরযন্ত্রের ক্যান্সারের জন্য একই নিয়ম পুরোপুরি প্রযোজ্য নয়। এমনকি অরোফ্যারিঞ্জিয়াল ক্যান্সারে এইচপিভি-সম্পর্কিত অবস্থাও স্টেজ নির্ধারণে প্রভাব ফেলতে পারে। তাই নিচের ব্যাখ্যাটি সাধারণ ধারণার জন্য।

টিএনএম পদ্ধতিতে স্টেজ নির্ধারণ

চিকিৎসকেরা সাধারণত তিনটি বিষয় বিবেচনা করেন। এই তিনটি তথ্য মিলিয়েই সামগ্রিক স্টেজ নির্ধারণ করা হয়।

  • T — টিউমার: মূল টিউমার কত বড় এবং আশপাশের কোন অংশে ছড়িয়েছে।
  • N — লসিকাগ্রন্থি: ঘাড়ের কাছাকাছি লসিকাগ্রন্থিতে ক্যান্সার গেছে কি না।
  • M — দূরের অঙ্গ: ক্যান্সার ফুসফুস বা শরীরের অন্য দূরের অংশে ছড়িয়েছে কি না।

স্টেজ ০

এই পর্যায়ে গলার আবরণের একেবারে ওপরের স্তরে অস্বাভাবিক কোষ পাওয়া যায়। এগুলো এখনো গভীর টিস্যুতে ছড়ায়নি। একে কার্সিনোমা ইন সিটু বলা হয়।

স্টেজ ১

সাধারণভাবে ক্যান্সার ছোট এবং যে জায়গা থেকে শুরু হয়েছে তার মধ্যেই সীমিত থাকে। কাছের লসিকাগ্রন্থি বা দূরের অঙ্গে ছড়িয়ে পড়ার প্রমাণ থাকে না।

স্টেজ ২

টিউমার কিছুটা বড় হতে পারে অথবা একই এলাকার কাছাকাছি অন্য অংশে ছড়িয়ে যেতে পারে। তবে সুনির্দিষ্ট সংজ্ঞা ক্যান্সার কোথায় হয়েছে তার ওপর নির্ভর করে।

স্টেজ ৩

এ পর্যায়ে টিউমার আরও বড় হতে পারে, কাছের গুরুত্বপূর্ণ অংশে যেতে পারে অথবা ঘাড়ের এক বা একাধিক লসিকাগ্রন্থিতে ছড়িয়ে থাকতে পারে।

স্টেজ ৪

এটি সাধারণত অগ্রসর পর্যায়ের ক্যান্সার বোঝায়। টিউমার আশপাশের গুরুত্বপূর্ণ গঠন, একাধিক বা বড় লসিকাগ্রন্থি কিংবা শরীরের দূরের কোনো অঙ্গে ছড়িয়ে থাকতে পারে।

নোট: তবে স্টেজ ৪ মানেই সব ক্ষেত্রে ক্যান্সার দূরের অঙ্গে ছড়িয়েছে—এমন নয়। বিভিন্ন ক্যান্সারে স্টেজ ৪-এর আবার আলাদা উপধাপ থাকে।

বাংলাদেশে গলার ক্যান্সারের চিকিৎসা

গলার ক্যান্সারের চিকিৎসা একটি নির্দিষ্ট নিয়মে সবার জন্য দেওয়া হয় না। ছোট স্বরতন্ত্রের ক্যান্সারের চিকিৎসা আর অগ্রসর হাইপোফ্যারিঞ্জিয়াল ক্যান্সারের চিকিৎসা এক হবে না। চিকিৎসার প্রধান পদ্ধতিগুলো হলো:

সার্জারি

অস্ত্রোপচারের মাধ্যমে ক্যান্সারযুক্ত টিউমার ও প্রয়োজন অনুযায়ী আশপাশের আক্রান্ত টিস্যু অপসারণ করা হয়। ছোট স্বরতন্ত্রের ক্যান্সারে কখনো মুখ দিয়ে বিশেষ যন্ত্র বা লেজারের সাহায্যে টিউমার সরানো সম্ভব হয়। রোগ বেশি ছড়ালে স্বরযন্ত্রের একটি অংশ বা কোনো কোনো ক্ষেত্রে পুরো স্বরযন্ত্র অপসারণ করতে হতে পারে। ঘাড়ের লসিকাগ্রন্থি আক্রান্ত হলে সেগুলোও অস্ত্রোপচারের মাধ্যমে অপসারণের প্রয়োজন হতে পারে।

রেডিওথেরাপি

রেডিওথেরাপিতে উচ্চ শক্তির রশ্মি দিয়ে ক্যান্সার কোষ ধ্বংস করা হয়। প্রাথমিক পর্যায়ের কিছু স্বরযন্ত্রের ক্যান্সারে এটিই প্রধান চিকিৎসা হতে পারে। আবার অস্ত্রোপচারের পর অবশিষ্ট ক্ষুদ্র ক্যান্সার কোষ ধ্বংস করতে বা অগ্রসর ক্যান্সারে কেমোথেরাপির সঙ্গে রেডিওথেরাপি দেওয়া হতে পারে।

কেমোথেরাপি

কেমোথেরাপির ওষুধ ক্যান্সার কোষ ধ্বংস বা তাদের বৃদ্ধি নিয়ন্ত্রণে কাজ করে। গলার কিছু অগ্রসর ক্যান্সারে রেডিওথেরাপির সঙ্গে একই সময়ে কেমোথেরাপি দেওয়া হয়। এই সমন্বিত চিকিৎসা কিছু পরিস্থিতিতে শুধু রেডিওথেরাপির তুলনায় বেশি কার্যকর হতে পারে, যদিও পার্শ্বপ্রতিক্রিয়াও বেশি হতে পারে।

লক্ষ্যভিত্তিক চিকিৎসা

এই চিকিৎসায় এমন ওষুধ ব্যবহার করা হয় যা ক্যান্সার কোষের বেড়ে ওঠার সঙ্গে জড়িত নির্দিষ্ট প্রোটিনকে লক্ষ্য করে কাজ করে। যেমন কিছু স্বরযন্ত্র ও হাইপোফ্যারিঞ্জিয়াল ক্যান্সারে ইজিএফআর নামের একটি প্রোটিনকে লক্ষ্য করে ওষুধ ব্যবহার করা হতে পারে। এটি সব রোগীর জন্য প্রয়োজন হয় না।

ইমিউনোথেরাপি

ইমিউনোথেরাপি শরীরের রোগ প্রতিরোধ ব্যবস্থাকে ক্যান্সার কোষ চিনতে ও আক্রমণ করতে সাহায্য করে। নির্বাচিত অগ্রসর, ফিরে আসা বা ছড়িয়ে পড়া মাথা-গলার ক্যান্সারে এই চিকিৎসা ব্যবহার করা হতে পারে। কোন রোগী এর উপযোগী, তা টিউমারের ধরন, আগের চিকিৎসা এবং কিছু বিশেষ পরীক্ষার ফল দেখে সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়।

চিকিৎসা কীভাবে নির্ধারণ করা হয়?

একই রোগের নাম হলেও দুই রোগীর চিকিৎসা আলাদা হতে পারে। চিকিৎসা ঠিক করার সময় কয়েকটি বিষয় একসঙ্গে দেখা হয়। ক্যান্সার গলার কোথায় হয়েছে, টিউমারের আকার, রোগের স্টেজ, লসিকাগ্রন্থিতে ছড়িয়েছে কি না, শরীরের অন্য অংশে গেছে কি না এবং রোগীর বয়স ও সামগ্রিক স্বাস্থ্য—সবই গুরুত্বপূর্ণ।

গলার ক্যান্সারের চিকিৎসা

স্বরযন্ত্রের ক্যান্সারের ক্ষেত্রে আরও একটি বড় বিষয় হলো সম্ভব হলে কণ্ঠস্বর, খাবার গেলা এবং স্বাভাবিকভাবে শ্বাস নেওয়ার ক্ষমতা ধরে রাখা। অনেক রোগীর চিকিৎসায় নাক-কান-গলা ও মাথা-ঘাড় সার্জন, ক্যান্সার বিশেষজ্ঞ, রেডিওথেরাপি বিশেষজ্ঞ, রোগতত্ত্ববিদ, পুষ্টিবিদ এবং কথা বলা ও গিলতে সহায়তাকারী বিশেষজ্ঞ একসঙ্গে কাজ করেন।

গলার ক্যান্সারের ঝুঁকি কমানোর উপায়

গলার ক্যান্সার সব ক্ষেত্রে প্রতিরোধ করা সম্ভব নয়। তবে দৈনন্দিন কিছু অভ্যাস বদলালে এবং পরিচিত ঝুঁকির কারণগুলো এড়িয়ে চললে এই রোগের ঝুঁকি কমানো যায়।

  • ধূমপান ও তামাক ছাড়ুন: সিগারেট, বিড়ি, জর্দা, গুল ও অন্যান্য তামাকজাত পণ্য গলার বিভিন্ন ক্যান্সারের বড় ঝুঁকির কারণ। যত দ্রুত সম্ভব এগুলো ছেড়ে দেওয়াই ভালো।
  • পান-সুপারি ও জর্দা এড়িয়ে চলুন: বাংলাদেশে পান, সুপারি ও জর্দা খাওয়ার অভ্যাস বেশ পরিচিত। নিয়মিত এসব ব্যবহার মুখ ও গলার কিছু ক্যান্সারের ঝুঁকি বাড়াতে পারে।
  • অতিরিক্ত অ্যালকোহল গ্রহণ থেকে বিরত থাকুন: দীর্ঘদিন বেশি পরিমাণে অ্যালকোহল গ্রহণ গলার ক্যান্সারের ঝুঁকি বাড়ায়। ধূমপানের সঙ্গে অ্যালকোহল থাকলে ঝুঁকি আরও বাড়তে পারে।
  • এইচপিভি সংক্রমণ প্রতিরোধে সচেতন থাকুন: কিছু উচ্চঝুঁকির এইচপিভি সংক্রমণ অরোফ্যারিঞ্জিয়াল ক্যান্সারের সঙ্গে সম্পর্কিত। বয়স ও ব্যক্তিগত অবস্থার ভিত্তিতে এইচপিভি টিকা প্রয়োজন কি না, চিকিৎসকের সঙ্গে আলোচনা করা যেতে পারে।
  • ফল ও সবজি নিয়মিত খান: প্রতিদিনের খাবারে তাজা ফল, শাকসবজি ও পুষ্টিকর খাবার রাখুন। দীর্ঘদিনের অপুষ্টিকর খাদ্যাভ্যাস এড়িয়ে চলা সামগ্রিক ক্যান্সার ঝুঁকি কমানোর অংশ।
  • কর্মক্ষেত্রে সুরক্ষা নিন: কাঠের ধুলা, রাসায়নিক, ধোঁয়া বা ক্ষতিকর বাষ্পের মধ্যে কাজ করলে প্রয়োজনীয় মাস্ক ও সুরক্ষা সরঞ্জাম ব্যবহার করুন।
  • দীর্ঘদিনের গলার সমস্যা অবহেলা করবেন না: গলা ভাঙা, গিলতে কষ্ট, ঘাড়ে চাকা বা এক পাশের কানে ব্যথা কয়েক সপ্তাহ ধরে থাকলে নাক-কান-গলা বিশেষজ্ঞের পরামর্শ নিন। দ্রুত পরীক্ষা করালে সমস্যার কারণ আগেই জানা যায়।

কখন দ্রুত নাক-কান-গলা বিশেষজ্ঞ দেখাবেন?

এক-দুই দিনের গলা ব্যথা বা সর্দির সঙ্গে গলা ভাঙা নিয়ে সাধারণত আতঙ্কিত হওয়ার কারণ নেই। কিন্তু সমস্যা যদি সারছে না বা ধীরে ধীরে বাড়ছে, তখন পরীক্ষা দরকার। বিশেষ করে দুই সপ্তাহের বেশি কণ্ঠস্বর বদলে থাকলে, কয়েক সপ্তাহ ধরে গিলতে সমস্যা হলে, ঘাড়ে নতুন চাকা দেখা দিলে, এক পাশের কানে দীর্ঘদিন ব্যথা থাকলে বা কারণ ছাড়া ওজন কমতে থাকলে নাক-কান-গলা বিশেষজ্ঞের পরামর্শ নিন।

শ্বাস নিতে খুব বেশি কষ্ট হলে বা শ্বাসনালি বন্ধ হওয়ার মতো অনুভূতি হলে দ্রুত জরুরি চিকিৎসা নেওয়া উচিত।

দীর্ঘদিন গলার সমস্যা থাকলে প্রফেসর ডাঃ কামরুল হাসান তরফদার এর পরামর্শ নিন

দুই সপ্তাহের বেশি গলা ভাঙা, কণ্ঠস্বরের অস্বাভাবিক পরিবর্তন, খাবার গিলতে সমস্যা বা ঘাড়ে চাকা থাকলে শুধু সাধারণ গলার সমস্যা ভেবে দীর্ঘদিন ওষুধ খেয়ে যাওয়া ঠিক নয়। আগে কারণটি জানা দরকার। প্রফেসর ডাঃ কামরুল হাসান তরফদার বাংলাদেশের সেরা নাক কান গলা বিশেষজ্ঞ। তাঁর নাক-কান ও গলার চিকিৎসায় ৪০ বছরের বেশি অভিজ্ঞতা রয়েছে। গলা বা স্বরযন্ত্রে সন্দেহজনক উপসর্গ থাকলে প্রাথমিক মূল্যায়ন, প্রয়োজনীয় পরীক্ষা এবং পরবর্তী চিকিৎসার দিকনির্দেশনার জন্য তাঁর পরামর্শ নেওয়া যেতে পারে।

গলার ক্যান্সার চিকিৎসায় ENT ও Head-Neck বিশেষজ্ঞের পরামর্শ
  • ৪০+ বছরের চিকিৎসা ও সার্জিক্যাল অভিজ্ঞতা
  • নাক-কান-গলা ও হেড-নেক সার্জন
  • গলা ও স্বরযন্ত্রের রোগ নির্ণয় ও চিকিৎসায় অভিজ্ঞ
  • মাথা ও ঘাড়ের টিউমার ও ক্যান্সার চিকিৎসায় অভিজ্ঞ
  • কণ্ঠস্বর ও গিলতে সমস্যার চিকিৎসা প্রদান
  • প্রয়োজন অনুযায়ী ল্যারিংগোস্কোপি ও অন্যান্য পরীক্ষা পরামর্শ
  • জটিল ENT ও Head-Neck সমস্যার সার্জিক্যাল ব্যবস্থাপনা
  • রোগভেদে ব্যক্তিগত চিকিৎসা পরিকল্পনা
চেম্বার
ধানমন্ডি ডায়াগনস্টিক অ্যান্ড কনসালটেশন সেন্টার
৭৯, সাতমসজিদ রোড, ঢাকা ১২০৫
শনিবার থেকে বৃহস্পতিবার (শুক্রবার বন্ধ)
সকাল ১০:০০টা – দুপুর ০১:০০টা
অ্যাপয়েন্টমেন্ট: +৮৮০১৭৭৪০৮০০৪৯
তাকওয়া স্পেশালাইজড হাসপাতাল, ঢাকা
১৫, নিউ ইস্কাটন রোড, মগবাজার, ঢাকা – ১০০০
শনিবার থেকে বৃহস্পতিবার (শুক্রবার ও সরকারি ছুটির দিন বন্ধ)
বিকেল ০৫:০০টা – রাত ০৯:০০টা
অ্যাপয়েন্টমেন্ট: ০১৮২৩-০২৫৩০৫

গলার ক্যান্সার সম্পর্কে সচেতন থাকুন

গলার ক্যান্সারের অনেক লক্ষণই প্রথম দিকে সাধারণ গলার সমস্যার মতো। তাই গলা ভাঙলেই ভয় পাওয়ার দরকার নেই। আবার সমস্যা মাসের পর মাস চললেও অবহেলা করা ঠিক নয়। বিশেষ করে দীর্ঘদিন কণ্ঠস্বর বদলে থাকা, খাবার গিলতে কষ্ট, ঘাড়ে চাকা, এক পাশে কানে ব্যথা বা অস্বাভাবিকভাবে ওজন কমে যাওয়া—এসবের কারণ পরীক্ষা করে দেখা দরকার। শুরুতেই কারণ জানা গেলে শুধু ক্যান্সার নয়, গলার অন্য অনেক সমস্যারও সঠিক চিকিৎসা দ্রুত শুরু করা যায়।

অ্যাপয়েন্টমেন্ট বুক করুন Diagonal arrow Icon

গলার ক্যান্সার নিয়ে সাধারণ প্রশ্নোত্তর

গলার ক্যান্সার নিয়ে অনেকেরই কিছু সাধারণ প্রশ্ন থাকে—কোন লক্ষণগুলো গুরুত্বপূর্ণ, কীভাবে রোগ ধরা পড়ে এবং চিকিৎসা কীভাবে করা হয়। নিচে এসব বিষয়ে সংক্ষিপ্ত ও সহজ উত্তর দেওয়া হলো।

গলার ক্যান্সারের প্রথম লক্ষণ কী?

গলার কোন অংশে ক্যান্সার হয়েছে তার ওপর প্রথম লক্ষণ নির্ভর করে। স্বরতন্ত্রের ক্যান্সারে দীর্ঘদিন গলা ভাঙা বা কণ্ঠস্বর বদলে যাওয়া প্রথম লক্ষণ হতে পারে। অন্য অংশের ক্যান্সারে গিলতে সমস্যা, গলা ব্যথা বা ঘাড়ে চাকা আগে দেখা দিতে পারে।

গলা ভাঙা কতদিন থাকলে ডাক্তার দেখানো উচিত?

কণ্ঠস্বরের পরিবর্তন দুই সপ্তাহেও না কমলে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া উচিত। বিশেষ করে ধূমপান বা তামাক ব্যবহারের ইতিহাস থাকলে বিষয়টি আরও গুরুত্ব দিয়ে দেখা দরকার।

গলার ক্যান্সার কোন পরীক্ষায় ধরা পড়ে?

প্রথমে গলা ও ঘাড় পরীক্ষা এবং ল্যারিংগোস্কোপির মাধ্যমে সন্দেহজনক অংশ দেখা হয়। ক্যান্সার নিশ্চিত করার জন্য সাধারণত বায়োপসি করে টিস্যু পরীক্ষা করা প্রয়োজন। রোগ কতটা ছড়িয়েছে দেখতে সিটি স্ক্যান, এমআরআই বা পিইটি-সিটি লাগতে পারে।

রক্ত পরীক্ষায় কি গলার ক্যান্সার ধরা পড়ে?

সাধারণ রক্ত পরীক্ষা দিয়ে অধিকাংশ গলার ক্যান্সার নিশ্চিত করা যায় না। নির্দিষ্ট পরিস্থিতিতে ইবিভি-সংক্রান্ত রক্ত পরীক্ষা কাজে লাগতে পারে, বিশেষ করে নাসোফ্যারিঞ্জিয়াল ক্যান্সারের ক্ষেত্রে। চূড়ান্ত রোগ নির্ণয়ে সাধারণত টিস্যু পরীক্ষা গুরুত্বপূর্ণ।

গলার ক্যান্সার হলে কি গলায় ব্যথা হয়?

হতে পারে, তবে ব্যথা থাকতেই হবে এমন নয়। দীর্ঘদিন গলা ব্যথা, ঢোক গিললে ব্যথা বা খাবার গিলতে কষ্ট গলার কিছু ক্যান্সারের লক্ষণ হতে পারে।

ধূমপান না করলেও কি গলার ক্যান্সার হতে পারে?

হ্যাঁ। ধূমপান একটি গুরুত্বপূর্ণ ঝুঁকি হলেও ধূমপান করেন না এমন মানুষেরও গলার ক্যান্সার হতে পারে। এইচপিভি বা ইবিভি সংক্রমণ, পান-সুপারি, তামাক, অ্যালকোহল এবং কিছু পরিবেশগত ঝুঁকিও নির্দিষ্ট ক্যান্সারের সঙ্গে সম্পর্কিত।

গলার ক্যান্সার কি ছোঁয়াচে?

না। ক্যান্সার ছোঁয়াচে রোগ নয়। রোগীর সঙ্গে বসা, কথা বলা, স্পর্শ করা বা একসঙ্গে খাবার খাওয়ার মাধ্যমে গলার ক্যান্সার অন্য মানুষের শরীরে ছড়ায় না।

গলার ক্যান্সারের বায়োপসি কি জরুরি?

সন্দেহজনক টিউমার সত্যিই ক্যান্সার কি না নিশ্চিত করার জন্য বায়োপসি সাধারণত অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এতে টিস্যুর ধরনও জানা যায়, যা পরবর্তী চিকিৎসা পরিকল্পনায় প্রয়োজন হয়।

গলার ক্যান্সারের চিকিৎসায় কি সবসময় অপারেশন লাগে?

না। ক্যান্সারের জায়গা ও স্টেজ অনুযায়ী কারও অস্ত্রোপচার, কারও রেডিওথেরাপি এবং কারও ক্ষেত্রে একাধিক চিকিৎসা একসঙ্গে প্রয়োজন হতে পারে। কিছু অগ্রসর রোগীর ক্ষেত্রে কেমোথেরাপি, লক্ষ্যভিত্তিক চিকিৎসা বা ইমিউনোথেরাপিও বিবেচনা করা হয়।

গলার ক্যান্সার হলে কতদিন বাঁচা যায়?

এ প্রশ্নের একটি নির্দিষ্ট উত্তর নেই। রোগীর আয়ু বা চিকিৎসার ফল নির্ভর করে ক্যান্সারের সঠিক ধরন, জায়গা, স্টেজ, চিকিৎসায় সাড়া এবং সামগ্রিক স্বাস্থ্যের ওপর। তাই শুধু “গলার ক্যান্সার” নাম শুনে কোনো নির্দিষ্ট সময় বলা চিকিৎসাবিজ্ঞানের দিক থেকে ঠিক নয়।

সতর্কতাঃ ওয়েবসাইটে প্রকাশিত তথ্যসমূহ শুধুমাত্র সচেতনতা ও শিক্ষামূলক উদ্দেশ্যে প্রকাশিত। এটি কোনোভাবেই চিকিৎসা পরামর্শের বিকল্প নয়। চিকিৎসা সংক্রান্ত যেকোনো সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে অবশ্যই একজন বিশেষজ্ঞ ডাক্তারের পরামর্শ গ্রহণ করুন।

Arrow